দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানের মধ্যে পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে আগস্টে স্বাক্ষরিত সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের ‘মক্কা চুক্তি’ প্রথমবারের মতো কার্যকর হলো।
সোমবার রিয়াদে জরুরি বৈঠকে চুক্তির শীর্ষ কমিটি সৌদি আরবে পাকিস্তানি ও তুর্কি বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা দ্রুত মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং অনুমোদিত ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন অনুযায়ী সৌদি আরবে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হবে। তবে কতসংখ্যক সেনা পাঠানো হবে বা তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব কী হবে, তা জানানো হয়নি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, হুথিদের দখলে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধারে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর অভিযানে প্রায় ১০০টি যুদ্ধবিমান সহায়তা দিচ্ছে।
বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, পাকিস্তানি ও তুর্কি বাহিনী ইতোমধ্যে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তাদের কার্যক্রমের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি রয়েছে। তবে ইয়েমেনে স্থল অভিযান পরিচালনা করছে মূলত সৌদি বাহিনী এবং তারাই হুথিদের কাছ থেকে এলাকা পুনর্দখল করছে বলে জানান তিনি।
এর ফলে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানের পাশাপাশি পাকিস্তানের ভূমিকা আপাতত প্রতিরক্ষামূলক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, পাকিস্তান কতদিন সরাসরি যুদ্ধের বাইরে থাকতে পারবে এবং তাদের ভূমিকার সীমা কোথায় থাকবে।
সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনাদের উপস্থিতি নতুন নয়। ১৯৬৭ সাল থেকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সৌদি সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। ১৯৮২ সালের একটি চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।
১৯৮৫ সালের একটি মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, সে সময় সৌদি সেনাবাহিনীতে ১৩ থেকে ১৪ হাজার পাকিস্তানি সদস্য কর্মরত ছিলেন। ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও সৌদি আরবে প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্ব পালনে পাকিস্তান বড় একটি সামরিক দল পাঠিয়েছিল।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করে। এতে এক দেশের ওপর আগ্রাসনকে উভয় দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়।
এ বছরের এপ্রিলে সৌদি আরব নিশ্চিত করে, যুদ্ধবিমান ও সহায়ক উড়োজাহাজসহ একটি পাকিস্তানি বাহিনী দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের কিং আবদুলআজিজ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে। তবে সৌদি আরবে মোট কত পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে, তা ইসলামাবাদ কখনো প্রকাশ করেনি।
সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী সৌদি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সৌদি আরব ও দেশটির পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তায় পাকিস্তানি সেনারা ইতোমধ্যে মোতায়েন রয়েছে।
মঙ্গলবার পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সৌদি আরব ও পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকার নিয়ে কোনো আপস নেই। তবে বাহিনী মোতায়েনের কার্যক্রমের বিস্তারিত গোপনীয়তার আওতায় থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
সৌদি আরবে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি অবশ্য এখনো পরিষ্কার নয়। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তুর্কি বাহিনীর উপস্থিতির কথা বললেও আঙ্কারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সেনা মোতায়েনের কথা নিশ্চিত করেনি।
ইস্তাম্বুলের ইবনে হালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোখান এরেলি বলেন, সৌদি আরবে তুরস্কের কোনো প্রকাশ্য স্থায়ী সামরিক মোতায়েন নেই। তুরস্কের সংবিধানের ৯২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশে সেনা পাঠানোর ক্ষমতা দেশটির পার্লামেন্টের হাতে। এখনো মক্কা চুক্তি অনুমোদন করেনি পার্লামেন্ট।
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের সম্ভাব্য ভূমিকা সরাসরি স্থলযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে কূটনৈতিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা সরবরাহের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে।
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফের বলেন, সৌদি আরব মক্কা চুক্তিকে শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে না রেখে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
তার মতে, আপাতত সৌদি আরবের লক্ষ্য হচ্ছে দেশটির ভূখণ্ড রক্ষা এবং আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। এর মাধ্যমে হুথিদের যেকোনো হামলা যে শুধু সৌদি-হুথি সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে না, সেটিও দেখাতে চায় রিয়াদ।
হুথিরা এরই মধ্যে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। সোমবার সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির দুটি বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে এবং এতে অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন।
সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান অবশ্য মক্কা চুক্তির যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করার কথা বলেছেন। তার ভাষ্য, হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও কমিটি সম্মত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ‘হামলার জন্য দায়ী সবাই’ কথাটি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয়েছে, যাতে হুথিদের পাশাপাশি তাদের সহায়তাকারীদের প্রতিও বার্তা দেওয়া যায়।
তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবেই তুলে ধরছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইশাক দার বলেন, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক এবং এর কোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য নেই।
ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন মনে করেন, পাকিস্তানের অবদান বড় আকারের সেনা মোতায়েনের পরিবর্তে বিশেষায়িত সক্ষমতার মধ্যে সীমিত থাকতে পারে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট, ড্রোন, যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগব্যবস্থা, সাইবার সক্ষমতা, প্রকৌশলী ও বিশেষ বাহিনীর সদস্য থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সহায়তার পাশাপাশি পাকিস্তান ও তুরস্ক ইয়েমেনের ভেতরে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেবে কি না।
থাফেরের মতে, বর্তমানে দুটি সমান্তরাল অভিযান চলছে। একটি সৌদি ভূখণ্ড রক্ষার জন্য এবং অন্যটি ইয়েমেনের ভেতরে সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে, যাতে হুথিরা শক্তিশালী অবস্থান থেকে সৌদি আরবে হামলা চালাতে না পারে।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পাকিস্তানি বাহিনী ইয়েমেনে হামলায় অংশ নিয়েছে কি না জানতে চাইলে খাজা আসিফ সরাসরি উত্তর দেননি। তিনি বলেন, সৌদি আরবকে রক্ষার জন্য যে ব্যবস্থার অধীনে পাকিস্তান অঙ্গীকারবদ্ধ, তার আওতায় তাদের হাতে থাকা সক্ষমতাগুলো সৌদি আরবের জন্যও ব্যবহার করা হবে।
ইরানও বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইয়েমেনে যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের খবর সত্য না হওয়াই তারা আশা করেন। নতুন কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
তেহরানের পারস্য উপসাগরীয় স্টাডিজ গ্রুপের বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়া বলেন, পাকিস্তানের মোতায়েন যদি শুধু সৌদি স্থাপনা রক্ষায় সীমিত থাকে, তাহলে ইরান তা মেনে নিতে পারে। কিন্তু পাকিস্তান যদি হুথিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেয়, তাহলে সেটিকে ইরান ‘লাল রেখা’ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
সৌদি আরব ইয়েমেনে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে চায় কি না, তার ওপর পরিস্থিতির পরবর্তী গতি অনেকটাই নির্ভর করবে। বিশ্লেষক থাফের মনে করেন, রিয়াদ সম্ভবত স্বল্পমেয়াদি ও তীব্র অভিযান চালিয়ে নিজেদের প্রতিরোধ সক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়।
তবে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে শুধু হুথিদের দখলে যাওয়া এলাকা পুনরুদ্ধার নয়, রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্যও প্রকাশ করেছে। ২০১৪ সাল থেকে সানা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি ভূখণ্ড ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অভিযান সীমিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু হুথিদের পুরোপুরি পরাজিত করা বা সানা পুনর্দখলের চেষ্টা করলে তা অনেক দীর্ঘ ও জটিল যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
এর আগে ২০১৫ সালে ইয়েমেন সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করেছিল পাকিস্তানের পার্লামেন্ট। একই সঙ্গে সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা পবিত্র স্থানগুলো হুমকির মুখে পড়লে দেশটির পাশে থাকার কথাও বলা হয়েছিল। নতুন মক্কা চুক্তিতেও সৌদি আরব ও পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টিকে সামরিক সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
এমএস/